মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
শুক্রবার, অক্টোবর ১৬, ২০২৬
সম্পাদকের পছন্দ
এই সপ্তাহের সেরা
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
শুক্রবার, অক্টোবর ০৯, ২০২৬
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০২৬
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
বুধবার, অক্টোবর ০৭, ২০২৬
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
রবিবার, অক্টোবর ০৪, ২০২৬
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ০১, ২০২৬
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৫, ২০২৬
সর্বশেষ লেখা
8

পরম খুঁটির আশ্রয়ে
সিলেটের প্রকৃতিতে তখন গোধূলির আলো। পাহাড়ের গায়ে লেপ্টে থাকা মেঘগুলো একটু একটু করে রঙ পাল্টাচ্ছে। ওপারে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত, এপারে সবুজ চা-বাগান আর পিয়াইন নদীর কলতান। কাজের সূত্রে এই স্বর্গরাজ্যেই আমার বসবাস। বিখ্যাত পর্যটন এলাকা হওয়ায় একটা দারুণ সুবিধা আছে—পুরনো দিনের চেনা মানুষগুলো যখনই এদিকের সৌন্দর্যে অবগাহন করতে আসে, কোনো না কোনোভাবে আমার সাথে দেখা হয়ে যায়। শৈশবের বন্ধু, প্রাক্তন সহকর্মী কিংবা চেনা কোনো মুখ হুট করে সামনে চলে এলে মনটা নিমেষেই ভালো হয়ে যায়।
গতকালও ঠিক তেমনি একটা সন্ধ্যা ছিল। অফিস শেষ করে বাজারের এক কোণে, পাহাড়-নদী দেখা যায় এমন একটি ছিমছাম রেস্তোরাঁয় বসেছিলাম চা খেতে। ঠিক তখনই দরজায় এসে দাঁড়াল এক দীর্ঘদেহী মানুষ। চোখের চশমাটা আর মুখের চেনা আদল দেখে চিনতে এক মুহূর্তও দেরি হলো না।
"আরে, তুই এখানে!"
বলেই জড়িয়ে ধরলাম তাকে। ও আমার স্কুলের বন্ধু। এখন একটা বড় ফ্যাক্টরির এইচআর, অ্যাডমিন ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। ব্যস্ত জীবনের চোরাবালিতে কতদিন যোগাযোগ ছিল না!
টেবিলে ধোঁয়া ওঠা চা আর গরম শিঙাড়া চলে এলো। শুরু হলো আড্ডা। স্মৃতির পাতা উল্টে আমরা ফিরে গেলাম শৈশবের সেই ধুলোবালি মাখা দিনগুলোয়। তারপর এলো কর্মজীবন, সংসার, আর বর্তমানের টানাপোড়েন। কিন্তু লক্ষ্য করলাম, বন্ধুর হাসির আড়ালে কোথাও একটা গভীর ক্লান্তি আর বিষাদের ছায়া।
এক কাপ চা শেষ করে ও হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। টেবিলের ওপর দুহাত রেখে নিচু গলায় বলল, "দোস্ত, বাইরে থেকে আমাদের জীবনটা যত মসৃণ দেখায়, ভেতরে ততটা নয়। বর্তমানে যেখানে কাজ করছি, সেখানে দু-একজন মানুষ আক্ষরিক অর্থেই আমার পেছনে লেগেছে। পদে পদে আমার কাজে ভুল ধরা, বিনা কারণে ঝামেলা পাকানো আর ওপর মহলে গিয়ে আমার নামে মিথ্যা নালিশ করা—এটাই তাদের রোজকার কাজ।"
আমি চুপ করে শুনছিলাম। ও একটু থেমে বলল, "সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ওদের খুঁটির জোর খুব শক্ত। ম্যানেজমেন্টের একদম শীর্ষ পর্যায়ের আশীর্বাদ আছে ওদের ওপর। সেই খুঁটির জোরেই আমাকে সারাক্ষণ মানসিক শান্তিতে থাকতে দেয় না, হুমকি-ধামকি দেয়। সত্যি বলতে, আমার জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।"
আমি চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "আচ্ছা দোস্ত, তুই কি তোর কাজে কোনো ফাঁকিবাজি করিস? বা এমন কোনো গাফিলতি, যা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে?"
ও একদম সোজা হয়ে বসল। চোখেমুখে সততার দৃঢ়তা নিয়ে বলল, "এক ফোঁটা না। তবে হ্যাঁ, এইচআর আর অ্যাডমিনের দায়িত্ব তো বুঝিস-ই—প্রচণ্ড চাপ থাকে। পাঁচশো-হাজারটা জিনিস একা সামলাতে গিয়ে কখনো হয়তো সময়ের কাজ ঠিক ওই মুহূর্তে শেষ করা সম্ভব হয় না। কিছুটা দেরি হয়। কিন্তু আমি আমার সততা আর নিষ্ঠায় বিন্দুমাত্র কমতি রাখি না।"
আমি হাসলাম। ওর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললাম, "তুই যদি নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকিস, তবে তোকে আমি এমন একটা ম্যাজিক ফর্মুলা বা পরামর্শ দিতে পারি, যা তোকে এই দুর্বিষহ অনুভূতি থেকে চিরতরে মুক্তি দেবে।"
বন্ধু উৎসুক হয়ে উঠল। চেয়ারটা আরও একটু এগিয়ে এনে বলল, "কী পরামর্শ দোস্ত? জলদি বল। আমি সত্যিই আর নিতে পারছি না।"
আমি রেস্তোরাঁর কাঁচের জানলা দিয়ে বাইরের রাস্তার দিকে তাকালাম। অন্ধকার নেমে এসেছে, ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বিশাল ও শক্ত বৈদ্যুতিক খুঁটি দেখিয়ে বললাম, "দোস্ত, ওই কারেন্টের খাম্বাটা দেখতে পাচ্ছিস?"
"হ্যাঁ, পাচ্ছি। কেন?"
"আচ্ছা, তোকে যদি বলি—এই খুঁটিটাকে না কেটে, না ছেঁটে, মাটির নিচে আরও না পুঁতে বা কোনোভাবে স্পর্শ না করে তোকে এটা ছোট করতে হবে। তুই কীভাবে করবি?"
বন্ধু আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমি কোনো পাগলামি করছি। ও কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, "কাটবো না, ছাঁটবো না, মাটির নিচেও দাবিয়ে দেবো না... তাহলে এটা ছোট হবে কীভাবে? এটা তো অসম্ভব!"
আমি রহস্যময় হেসে বললাম, "না বন্ধু, এটা বৈজ্ঞানিক এবং আধ্যাত্মিক, দুইভাবেই সম্ভব। একটু ভালো করে ভেবে দেখ। তুই যদি ওই খুঁটিটার ঠিক পাশে তার চেয়ে দ্বিগুণ বড় আর একটা শক্তিশালী খুঁটি এনে দাঁড় করিয়ে দিস, তাহলে আগের খুঁটিটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ছোট দেখাবে না?"
বন্ধুর চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। ও যেন এক মস্ত বড় ধাঁধার চাবিকাঠি পেয়ে গেছে! গভীর বিস্ময়ে ও বলল, "হ্যাঁ... তা তো অবশ্যই! বড় কিছুর পাশে রাখলে তো ছোটটা এমনিতেই গুরুত্বহীন আর ছোট হয়ে যায়। কিন্তু আমি তো এভাবে কোনোদিন ভাবিনি!"
আমি ওর পিঠে হাত রেখে নরম গলায় বললাম, "পৃথিবীর নিয়মটাই এমন দোস্ত। মানুষ যত বড় খুঁটির জোরই দেখাক না কেন, তার চেয়ে বড় একটা খুঁটি সবসময় থেকে যায়। আর এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে শক্তিশালী আর অভেদ্য খুঁটি কে জানেন? স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা। তাঁর ওপরে আর কোনো শক্তি নেই, কোনো খুঁটি নেই।"
বন্ধুর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, কিন্তু সেখানে তখন এক ফোঁটা জল চিকচিক করছে।
আমি বলতে থাকলাম, "তুই যদি তোর কর্মে সৎ থাকিস, যদি তোর আত্মবিশ্বাস থাকে যে তুই কারও ক্ষতি করিসনি, তবে মানুষের ওই কাগজের তৈরি খুঁটি নিয়ে ভয় পাওয়া বন্ধ কর। তোর মনের সব আকুতি, সব অভিযোগ তুই সেই পরম শক্তির কাছে নিবেদন কর। যখন তুই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় খুঁটির আশ্রয় নিবি, তখন দেখবি দুনিয়ার এই ছোটখাটো খুঁটিগুলো তোর চোখে ধূলিকণার মতো তুচ্ছ মনে হবে। আল্লাহ যদি তোর মনের ভেতরের কান্না একবার শোনেন, তবে তিনিই তোর বিচার করবেন। আর আল্লাহর দরবার থেকে কেউ কোনোদিন খালি হাতে ফেরে না।"
বন্ধু চশমাটা খুলে চোখটা মুছল। রুদ্ধকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, "কিন্তু দোস্ত, আমি কীভাবে তাঁর কাছে পৌঁছাবো? আমার মনের কথা কীভাবে বলব?"
"এর একটা খুব সুন্দর ও পবিত্র নিয়ম আছে," আমি বললাম। "যখন গভীর রাতে পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়বে, প্রকৃতি শান্ত হয়ে যাবে—তখন তুই বিছানা ছেড়ে উঠবি। ঠাণ্ডা পানিতে অজু করে পাক-পবিত্র হয়ে জায়নামাজে দাঁড়াবি। প্রথমে অনুতপ্ত হৃদয়ে তাওবা ও ইস্তেগফার পড়বি। তারপর পরম ভক্তিভরে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করবি। নামাজ শেষে যখন সিজদায় যাবি, তখন আর কোনো লোকদেখানো ভাষা নয়; তোর মনের সব কষ্ট, সব যন্ত্রণা, সব আকুতি একদম শিশুর মতো কেঁদে কেঁদে আল্লাহর দরবারে ঢেলে দিবি। সিজদারত অবস্থায় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছে থাকে। তুই তোর আরজি সেখানে পেশ কর, নিশ্চয়ই তিনি তোর মনের কথা কবুল করবেন।"
আমার কথা শেষ হতেই বন্ধুর চোখ দিয়ে দু ফোঁটা অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। ও টেবিলে রাখা আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল, "দোস্ত... তুই আজ আমাকে শুধু একটা পরামর্শ দিলি না, তুই আমাকে একটা নতুন জীবন দিলি। একটা নতুন দর্শন দিলি। আমি এতদিন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ভয় পাচ্ছিলাম, তুই আমাকে আলোর পথ দেখালি। আমি তোর এই কথা আজীবন মনে রাখব।"
আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বন্ধুকে শক্ত করে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলাম। ওর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললাম, "তুই সৎ, তুই নিষ্ঠাবান। তোর ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই। সময়ের চাকা ঘুরবেই বন্ধু। আজ যারা তোর পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যারা তোকে যন্ত্রণা দিচ্ছে, একদিন দেখবি তাদের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। আল্লাহ তোকে তোর ধৈর্যের সেরা প্রতিদান দেবেন। শুধু বিশ্বাসটা রাখ।"
রেস্তোরাঁর বাইরে তখন রাত নেমে এসেছে। কিন্তু আমার বন্ধুর চোখে-মুখে আমি যে প্রশান্তির আলো দেখতে পাচ্ছিলাম, তা বাইরের যেকোনো আলোর চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল আর পবিত্র ছিল।









মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।